রামুর বাঁকখালী নদীর তীরে প্রতিমা বিসর্জনে হাজারো মানুষের ঢল

আবদুল মালেক,রামু:
কক্সবাজারের রামুতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হল সনাতনধর্মাবলম্বীদের  প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রী শ্রী শারদীয় দুর্গাপূজা।

মঙ্গলবার ৮ অক্টোবর  রামু বাঁকখালী নদীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী এই আয়োজন সমাপ্ত  হয়। দিনটি ছিল সরকারি ছুটির দিন। ভক্তদের চোখের জলে ভাসিয়ে সপরিবারে দুর্গতিনাশিনী দেবীদূর্গা বাবার বাড়ি থেকে ফিরে গেলেন স্বামীর ঘর কৈলাসে। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের অসুরিক প্রবৃত্তি যেমন- কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসা বিসর্জন দেয়াই মূলত বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এ প্রবৃত্তিগুলোকে বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য। সনাতন বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকামতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবীদুর্গা এবার মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসছেন ঘোড়ায় চড়ে এবং স্বর্গালোকে বিদায় নেন ঘোড়ায় চড়ে।
রামু উপজেলা প্রতিমা নিরঞ্জন পরিষদের সভাপতি ডা. আশুতোষ চক্রবর্তী মন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিমা নিরঞ্জন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল। প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা।উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজার সদর হাসপাতালের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক ডা.দুলাল চন্দ্র পাল।প্রধান অতিথির বক্তব্যে রামু উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সোহেল সরওয়ার কাজল বলেন,রামু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবাসস্থল। আজকের এই প্রতিমা বিসর্জনের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হল।রামুর জনগণ শান্তিতে বিশ্বাসী।এখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ,রাখাইনসহ সর্বস্তরের মানুষ পরস্পর সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে বাস করে।আজকের এই প্রতিমা নিরঞ্জন অনুষ্ঠানে হাজার হাজার লোকের সমাগম তার প্রমাণ বহন করে।আজকের এই লোক সমাগমে সব ধর্মের মানুষের অংশ গ্রহণ প্রমাণ করে রামুর জনগণের সম্প্রীতি।তিনি সকলকে বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন।প্রধান বক্তার বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণয় চাকমা জানান,রামুর সনাতন ধর্মাবলম্বী লোকজন শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবারের পূজা উদযাপন করেছে।তারা তাদের মাঝে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে এই আয়োজন সমাপ্ত করেছে।সরকারের প্রশংসা করে তিনি বলেন,মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ হল সবাই যেন শান্তি পূর্ণ পরিবেশে নিজ নিজ ধর্ম চর্চা করতে পারে তার অনুকুল পরিবেশ নিশ্চিত করা।আমি মনে করির,রামুর সনাতনধর্মাবলম্বী লোকজন এই পরিবেশে পূজা অর্চনা করতে পেরেছে।প্রতিমা নিরঞ্জন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার ভূমি চাই থোয়াইহলা চৌধুরী, রামু থানা অফিসার ইনচার্জ আবুল খায়ের, ফতেখাঁরকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফরিদুল আলম।অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রামু কেন্দ্রীয় কালীবাড়ির সভাপতি রতন মল্লিক,প্রকাশ সিকদার,মাস্টার সুনীল শর্মা,বিভাস সেন গুপ্ত জিগমী,সজল,ব্রাহ্মণ,প্রিয়তোষ চক্রবর্তী পিন্টু,চন্দন দাশ গুপ্ত ,মিঠুন চন্দ্র নাথ  সহ প্রশাসনিক,রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।


মঙ্গলবার সকালে মণ্ডপে মণ্ডপে দশমী পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন করা হয়। বিষাদের ছায়া ছিল ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টাসহ বিভিন্ন বাদ্যে, আলোকিত করা ধূপ আরতি ও দেবীর পূজা-অর্চনায়। বিসর্জনের আগে সকাল থেকে রামুর পূজা মণ্ডপগুলোতে ও মন্দিরে মন্দিরে চলে সিঁদুর খেলা আর আনন্দ উৎসব।
এর আগে বিকাল ৩ ঘটিকার প্রতিমা বিসর্জনের উদ্দেশ্যে  রামুর সার্বজনীন কালীবাড়ি মন্দির থেকে বিকেলে রামু উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে বের হয় বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রা।   শোভাযাত্রাটি রামুর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে বাঁকখালী নদীতে বিসর্জনের জন্য জড়ো হয়। ঢাকের শব্দে আর ধূপের গন্ধে মুখরিত হয়ে উঠে সমগ্র রামু। বিজয়া শোভাযাত্রা ও প্রতিমা বিসর্জনে অংশ নিতে দুপুর গড়িয়ে যেতেই ভক্তরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে সমবেত হতে শুরু করে রামু চৌমুহনীতে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানের পূজামণ্ডপ থেকে আসা প্রতিমা নিয়ে ট্রাকগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যায় রাস্তায়। বিভিন্ন বয়সী নারী- পুরুষ নেচে-গেয়ে শোভাযাত্রাকে আরো বর্ণিল করে তোলে। যাত্রাপথে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশ সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখে।
রামুর বাঁকখালী নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হয় প্রতিমা নিরঞ্জন অনুষ্ঠান। রামুর বাঁকখালী নদীতে যেসকল মণ্ডপ প্রতিমা নিরঞ্জনে অংশ নেয় সেগুলো হল নাথ পাড়া দূর্গা মণ্ডপ, কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী দূর্গা মণ্ডপ,তেমুহনী শতবর্ষ বটমূল দূর্গা মণ্ডপ,,শ্রীকুল পূজা মণ্ডপ, সার্ববজনীন রামু  বাজার পূজা মণ্ডপ ।উক্ত অনুষ্ঠানে হাজার হাজার সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী পুরুষ অশ্রু সজল নয়নে দেবীকে বিদায় জানান।
। সন্ধ্যায় ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ করেন ও মিষ্টিমুখ করেন। প্রথা অনুযায়ী প্রতিমা বিসর্জনের পর সেখান থেকে শান্তিজল নিয়ে আসতে হবে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার রামুতে ৩০ টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হয়।