‘’আমি যখন শিক্ষক ছিলাম’’- (১ম অংশ)

মোহাম্মদ আইয়ুব:

চট্টগ্রাম সরকারি মহসীন কলেজে মাস্টার্সে পড়ছিলাম। একদিন পত্রিকায় একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি চোখে পড়ল। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। কাগজপত্র গুছিয়ে আবেদন করলাম। যথাসময়ে প্রবেশপত্র পেলাম। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলাম। লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভাইবা দিলাম। ভাইবা বোর্ডের পাঁচ সদস্যই প্রশ্ন করলেন। সব কটি প্রশ্নের উত্তর দিতে সক্ষম হলাম। আমার শিক্ষা সনদ গুলি দেখলেন। সবশেষে ভাইবা বোর্ডের প্রধান জেলা প্রশাসক মহোদয় প্রশ্ন করলেন–
“আপনি কি সত্যি সত্যি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষকতা করবেন?
-জ্বি। করব, স্যার।
ঠিক আছে। আপনি আসেন।
-ধন্যবাদ, স্যার। আসসালামু আলাইকুম।

আমার কেন জানি মনে হলো, আমার প্রশ্নোত্তর ও শিক্ষাসনদ দেখে ভাইবা বোর্ডের সবাই সন্ত্তষ্ট হয়েছেন। এসএসসি পরীক্ষার পর থেকেই নিয়মিত ৩/৪ ব্যাচ টিউশন করতাম। নিজের প্রতি মোটামুটি আত্মবিশ্বাস ছিল।

এডিবি’র অর্থায়নে পরিচালিত প্রজেক্টে নিয়োগ পাওয়া প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকতার পাশাপাশি নিয়মিত পড়াশুনা, টিউশন, মৎস্য চাষ এবং কৃষি কাজ করা ছিল আমার নিত্য দিনের রুটিন কাজ। এক কথায়-Earning and learning all-at-once.

মাস চারেক পর একদিন সকালের টিউশন শেষে, স্কুলে যাওয়ার জন্য স্টেশনে বাসের অপেক্ষায় ছিলাম। আমার এক বন্ধু বলল- গতকাল প্রাইমারি শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত রেজাল্ট প্রকাশ করেছে। তোমার খবর কী ?
আমি বললাম, কই! আমি তো জানি না।

তখনো তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থার এত উন্নতি সাধিত হয়নি যে, কারো কাছ থেকে মোবাইলে সংবাদ নেব। হকারের কাছ থেকে দুই টাকা দিয়ে একটি “দৈনিক কক্সবাজার” পত্রিকা কিনলাম। চোখ বুলাতেই “প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত রেজাল্ট প্রকাশ” শিরোনাম চোখে পড়ল। আগ্রহের সাথে নিজের রোল নাম্বারটা আছে কিনা, খুঁজতে শুরু করলাম। কিন্তু বিধিবাম। বাস চলে আসল। এই বাস মিস করলে অ্যাসেম্বলি ক্লাস মিস হবে। অ্যাসেম্বলি ক্লাস মিস করলে প্রধান শিক্ষক বাবু সুবর্ণ বড়ুয়ার কড়া হুঁশিয়ারী শুনতে হবে “অ্যাবসেন্ট দেব”। অগত্যা ইচ্ছার বিরুদ্ধে পত্রিকাটি গুটিয়ে বাসে উঠে পড়লাম। বাসে কোন সিট খালি নেই। আমি এবং মুকুন্দ স্যার পাশাপাশি দাঁড়ালাম।

মুকুন্দ স্যার হলেন-আমার প্রাইমারি স্কুল জীবনের শিক্ষক।পুরো নাম মুকুন্দ প্রসাদ রুদ্র। গণিত পড়াতেন। অত্যন্ত কড়া মেজাজের লোক। ক্লাসে ঢুকার সাথে সাথেই পিন পতন নীরবতা নেমে আসত। স্যার যতক্ষণ অংক করাতেন কেউ টু শব্দটি পর্যন্ত করত না। নতুন নতুন নিয়মের গ্যাড়াকলে পড়ে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেজাজ কিছুটা কমেছে। এখন একই স্কুলে শিক্ষকতা করি।

আমার বাল্য বন্ধু খোরশেদও এই স্কুলের এডিবি’র প্রজেক্টের শিক্ষক ছিল (বর্তমানে উখিয়া সরকারি মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক)। ছোট বেলা থেকেই খোরশেদ আর আমি ছিলাম দু’টি দেহের একটি প্রাণ। বছর দুয়েক আগে খোরশেদ এর সাথে আমার তুচ্ছ বিষয় নিয়ে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। সেই শিশু বেলার আঙ্গুল কেটে আড়ি কাটার মত কথা বলা বন্ধ। প্রতিদিন দেখা হয়, অফিসে এক সাথে বসা হয়, কিন্তু কথা হয় না। মুকুন্দ স্যারের বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হলে একদিন সকল শিক্ষক-শিক্ষিকার সামনে বললেন—তুমি আর খোরশেদ ক্লাসমেট ছিলে না? উত্তরে আমি বললাম—জ্বি স্যার।
তোমাদের মধ্যে কি হয়েছে ? কোন দিন কথা বলতে দেখলাম না যে!
আমি কোন উত্তর দিলাম না, খোরশেদও দিল না।
তখন মুকুন্দ স্যার বললেন-Two lions can’t stay in a forest.
সাথে সাথে আমি বললাম-One (lion) will be transferred to another forest soon.

‌দুইদিন পর কাকতালীয়ভাবে খোরশেদের পাগলির বিল সরকারি প্রাইমারি স্কুলে বদলী হল। সবাই মনে করল যে, আমি তার বদলী করিয়েছি। আর আমি মনে মনে ভাবি-ঝড়ে বক মরল, আর ফকিরের কেরামতি ফল্ ল।
খোরশেদ পাগলির বিল সরকারি প্রাইমারি স্কুলে যোগদান করে ৪১৫/-টাকা (এক মাসের বেতনের এক চতুর্থাংশ) দিয়ে একটি পুরাতন বাইসাইকেল কিনল। উপজেলা সদর থেকে বাসে মরিচ্যা যেত। মরিচ্যা থেকে সাইকেল চালিয়ে পাগলির বিল সরকারি প্রাইমারি স্কুলে যেত। স্কুল ছুটির পর সাইকেল চালিয়ে মরিচ্যা ফিরে আসত। এক দোকানে সাইকেলটিতে চায়না তালা লাগিয়ে রেখে পুনরায় বাস যোগে বাড়িতে ফিরে আসত।
খোরশেদ যে সাইকেল কিনেছে এটা কারো বিশ্বাস হচ্ছিল না। একদিন আমি আর নেজাম মাস্টার তাকে অনুসরণ করে দেখতে গেলাম। সত্যি সত্যিই সে সাইকেল কিনেছে এবং প্রত্যক্ষ করলাম, দিব্যি সাইকেল চালিয়ে স্কুলে যাচ্ছে । সাইকেলটির দুই চাকার উপরে মাডগার্ড (ছাউনি) নেই। প্রতিটি নাট-বল্টুর রং উঠে অদ্ভুত মডেলাকার ধারণ করেছে। দূর থেকে দেখতে গরম পানিতে ঝলসে যাওয়া পশমহীন বড়সড় কঙ্কালসার কুকুরের মতো দেখায়। এই সাইকেল কোথা থেকে কিনেছে তা নিয়ে বন্ধু মহলে বেশ বিতর্ক আছে। কেউ বলে, জমিদার পুত্র মৌলভী ফজলুল হক চল্লিশের দশকে যৌতুক হিসেবে যেটি পেয়েছিল, সেটি কিনেছে। আবার কারো মতে, ভাঙ্গারির দোকান থেকে কিনেছে। প্রকৃত পক্ষে সাইকেলটি কোথা থেকে কিনেছিল, সে রহস্যের জাল আজও ভেদ করা সম্ভব হয়নি ………………………. (চলবে)

লেখক-
অফিসার ইনচার্জ
লালমাই থানা, কুমিল্লা।